নোয়াখালী প্রতিনিধি:
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর ফরহাদ শামীমের বিরুদ্ধে ঘুষ দুর্ণীতি ও অনিয়মের রামরাজত্ব কায়েমের অভিযোগ উঠেছে রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক সর্ব মহল থেকে। সংশ্লিষ্ট সকলেরই অভিযোগ এ উপজেলায় কিছু প্রকল্পের ১০শতাংশ এবং কোনো কোনো প্রকল্পে ২০শতাংশ ঘুষ গ্রহণ ব্যাতিত কোনো ফাইলই নড়াচড়া করে না।
বৃহস্পতিবার সকালে উপজেলা আইন-শৃংখলা সভায় নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর ফরহাদ শামীমের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্ণীতি ও অনিয়মের বিষয়ে একাধিক বক্তার বক্তব্যে উঠে আসে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলা পরিষদ ও বসুরহাট পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ সমাপ্ত হলে বিল পেতে নানা হয়রানির শিকার হন ঠিকাদাররা। ইউএনও’র চাহিদা মত ঘুষের টাকা পাওয়ার পর বিলগুলো স্বাক্ষর করেন তিনি। এডিপি, উন্নয়ন, টিআর, কাবিখা, কাবিটা, শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ, এলজিইডিসহ বিভিন্ন দপ্তরের উন্নয়ন কাজগুলো থেকে ১০ শতাংশ-২০শতাংশ ঘুষ গ্রহণ করে বিল পাশ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউনিয়ন পরিষদের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আমার ইউনিয়নে ১% প্রকল্পের প্রায় ১৪ লাখ টাকা দিয়ে ১০% ঘুষ নেন ইউএনও তানভীর ফরহাদ শামীম। ১% প্রকল্পের বরাদ্দকৃত টাকা সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদের ব্যাংক হিসাব থেকে উত্তোলনের সুযোগ থাকলেও ইউএনও শামীম তাঁর প্রত্যয়ন ব্যাতীত কোন টাকা ছাড় না দেয়ার লিখিত নির্দেশনা দেন, সোনালী ব্যংক বসুরহাট ও চৌধুরীহাট শাখা কতৃপক্ষকে। ওই খাত থেকে ইউএনও শামীমকে ১০% শতাংশ হারে ঘুষ প্রদানের পর প্রত্যয়ন দেয়া হলে সোনালী ব্যাংকের শাখাদ্বয় থেকে টাকা উত্তোলন করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলজিইডির এক ঠিকাদার অভিযোগ করে বলেন, একটি প্রকল্পের সমাপ্তি বিল পাওয়ার জন্য ইউএনও’র কাছে একাধিকবার যান, এলজিইডির অফিস সহকারী। পরবর্তীতে একান্তভাবে দেখা করে তার চাহিদাকৃত ঘুষের টাকা দেয়ার পর ওই বিলে স্বাক্ষর করা হয়।
অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত বীর নিবাস নির্মানের ১৫টি ঘরের ঠিকাদার মেসার্স মুন্না ট্রেডার্স ও ৫টি ঘরের কাজ পান মেসার্স তৃষা এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি বীর নিবাসের জন্য বরাদ্দ ছিল ১২লাখ ৫০ হাজার টাকা। এসব বীর নিবাস নির্মাণ তদারকীর দায়িত্বে ছিলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানদ্বয়ের প্রতিনিধি হাজী নিজাম উদ্দিন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমি ৪০ লাখ টাকার বিলের জন্য দীর্ঘদিন ঘুরতে হয়েছে। পরে দুদকে অভিযোগ দেয়ার কথা বলে হুমকি দিলে ইউএনও ডাকবাংলো বাসায় বসে দু’লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ওই বিলে স্বাক্ষর দেন।
উপজেলার চরহাজারী ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার আবদুল্লা আল মামুন সুমন বলেন, এডিপি, উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডারের বাহিরে পিআইসি প্রকল্প দিয়ে আমাদের কাছ থেকে ২০শতাংশ হারে ঘুষ নেন। অন্যান্য টেন্ডারের কাজগুলো থেকে ১২শতাংশ হারে ঘুষ গ্রহণ করেন।
এছাড়াও তার বিরুদ্ধে উপজেলা পরিষদের সুইপার পদে কর্মরত বেলালকে পরিষদের কাজ না করিয়ে নিজ বাসায় সার্বক্ষনিক কাজ করানোর অভিযোগও রয়েছে।
নিয়োগ বিহীন ইউএনও’র গাড়ী চালক মোঃ মমিন উল্যা দীর্ঘ ১০ বছর যাবত চালক হিসেবে রয়েছে। তাকে অনৈতিক ভাবে দেয়া হয়েছে উপজেলা পরিষদের ফ্যামেলি বাসা। চালক মোমিনকে মাসিক বেতন দেয়া হয়- গাড়ীর জ্বালানী, মেরামত ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে অবৈধ ভাবে অতিরিক্ত বিল করে, ১% প্রকল্প এবং উপজেলা পরিষদের আনুসাঙ্গিক বিবিধ খাতের বিল থেকে।
অবৈধভাবে গড়ে ওঠা উপজেলার চরএলাহী ও মুছাপুর ইউনিয়নে বালু মহালগুলো থেকে মাসিক মোটা অংকের ঘুষ নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কিছুদিন পুর্বে অভিযান চালিয়ে বাল্ক হেড, ড্রেজার, বালুবহনকারী ট্রাক, যন্ত্রপাতি ও কয়েক লাখ ঘনফুট বালু জব্দ করে। এ অভিযানের সময় ১৮জনকে গ্রেফতার করে এবং বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও দেয়া হয়েছিল। নোয়াখালী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের কয়েক কর্মকর্তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ইউএনও তানভীর মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পুনরায় চালু করায় জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের ওপর গণআস্থা সংকট তৈরী হয়েছে। এসব অবৈধ বালু মহাল জনদুর্ভোগ বাড়ায় স্থানীয়রা কয়েকবার বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন করার পর এ অজুহাতে প্রশাসন লোক দেখানো অভিযান করে বন্ধ করে অবৈধ বালু মহালগুলো পুনরায় চালু করেছে।
মেসার্স সেজান ট্রেডার্স নামের বালু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বেলাল জানান, ইউএনও ও ডিসি কিছু নির্দেশনাসহ সিদ্ধান্ত করে আমাদের বালু মহলগুলো পুনরায় চালু করা হয়েছে। এসময় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানভীর ফরহাদ শামীম নোয়াখালী জেলা প্রশাসকের সাথে ভিডিও কলে আমাদের সাথে কথাও বলে দিয়েছেন।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে নোয়াখালীর সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক খন্দকার ইসতিয়াক আহমেদ বলেন, কোম্পানীগঞ্জে কোন বালু মহালই নেই। আমার সাথে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইউএনও এবং বালু মহালের মালিকদের সাথে ভিডিও কলের বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
এর আগেও উপজেলার চরএলাহী ঘাট থেকে প্রতিদিন মোটা অংকের চাঁদা আদায়, লোভনীয় মাছ তার কাছে উপঢৌকন হিসেবে দেয়ার বিষয়ে একাধিক জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।
আইন-শৃংখলা কমিটির সভায় সভাপতি ইউএনও (রুটিন দায়িত্ব) ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রুবাইয়া বিনতে কাশেম বলেন, এ উপজেলায় কোন বালু মহালের অনুমোদন নাই। যারা বালু ব্যবসা করে তা অবৈধ।
উল্লেখ্য, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর ফরহাদ শামীমের সাবেক কর্মস্থল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলায় থাকাকালিন সময় বালু মহালগুলোর কাছ থেকে ঘুষ বাণিজ্যসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন করেন ছাত্র জনতা ও স্থানীয়রা। এ সংক্রান্ত একাধিক ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে।
অভিযুক্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানভীর ফরহাদ শামীম তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, এগুলোর কোন সত্যতা নেই।




