নিজস্ব প্রতিবেদক
খুলনায় পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করে নায়ের তাকবির আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়েছিল ঘাতকেরা। হামলাকারীদের অনেকের মুখ ছিল গামছা দিয়ে ঢাকা। অনেক কপালে ছিল পতাকা ও লাল কাপড় বাঁধা। প্রায় সবাই ছিল হিংস্র। এদিকে ড্রেনের মধ্যে চার ঘণ্টা থেকে প্রাণ বাঁচান সহকারী পুলিশ কমিশনার সৌমেন বিশ্বাস।
নিহত সুমন কুমার ঘরামী খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সোনাডাঙ্গা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার সৌমেন বিশ্বাসের দেহরক্ষী ছিলেন। স্ত্রী ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন খুলনা নগরের বয়রা এলাকায়। তার বাড়ি বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলায়। সুশীল কুমার ঘরামী ও গীতা রানী ঘরামীর সন্তান তিনি।
নিহত সুমন ঘরামীর স্ত্রী মিতু বিশ্বাসের বিলাপ থামছে না। সামনে যাকে পাচ্ছিলেন, ধরে ধরে আহাজারি করছিলেন। কখনো বিলাপ করতে করতে জড়িয়ে ধরেছিলেন অন্যকে। বিলাপের পাশাপাশি কখনো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মো. মোজাম্মেল হকের সামনে যেতেই সুমনের স্ত্রী মিতু বিশ্বাস বলতে থাকেন, সুমন কই? খালি ডিউটি, ডিউটি। আমার সুমন কই? আপনাদের ডিউটি করতে গিয়ে সুমন মারা গেছে…।’ পুলিশের অন্য এক কর্মকর্তার পা জড়িয়ে ধরে বলছিলেন, স্যার, আমার সুমনকে এনে দেন…।’
শুক্রবার (২ আগস্ট) বিকেল ৪টার দিকে খুলনার গল্লামারী সেতুর ওপর অবস্থায় নেয় আন্দোলনকারীরা। পুলিশ গল্লামারী মোড় থেকে দফায় দফায় সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা চালায়। সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটের দিকে গল্লামারী কাঁচাবাজারে আন্দোলনকারীরা পুলিশের কয়েকজন সদস্যকে বেধড়ক পেটান। এ সময় বাজারের একটি দোকানে পুলিশের চার সদস্য আটকা পড়েন। কিছুক্ষণ পর দোকানের শাটার খুলে তাঁরা বাইরের পরিস্থিতি দেখতে বের হলে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছোড়েন। পরে ক্ষোভকারীরা পুলিশের ওই সদস্যদের বেধড়ক পেটান। এ সময় পুলিশ কনস্টেবল সমুনকে দোকানের পেছনে পরিত্যক্ত জঙ্গলে আশ্রয় নিলে সেখানে তাকে লোডার রড-বাঁশ ইট দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এসময় উপর হয়ে পড়ে ছিলেন পুলিশ সদস্য সুমন কুমার ঘরামী।
পুলিশের উপর হামলাকারীদের অনেকের মুখ ছিল গামছা দিয়ে ঢাকা। অনেক কপালে ছিল পতাকা ও লাল কাপড় বাঁধা। প্রায় সবাই ছিল হিংস্র। অসভ্য ভাষায় গালাগাল করে তাঁর মৃত্যু না হওয়া পযন্ত পেটানো হয়। তার মৃত্যু নিশ্চিত করে নায়ের তাকবির আল্লাহু আকবার স্লোগান দেয়া হয়। পুলিশ সদস্যকে হত্যার পর সবাই নিরাপদ গন্তব্যে চলে যায়।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সোনাডাঙ্গা জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার সৌমেন বিশ্বাস জানান, তার সঙ্গে ছিলেন সুমন কুমার ঘরামী। সংঘর্ষের একপর্যায়ে দলছুট হয়ে দু’জন একটা দোকানের ভেতর আশ্রয় নিই। সেখানে সাটার লাগিয়ে দিয়ে পরে দোকানদারই খুলে দেয়। সেখানে আটকে পড়া পুলিশেরা যে যার মতো দৌড় দেয়। সহকারী পুলিশ কমিশনার সৌমেন একটা ঝুপড়ির মধ্যে আশ্রয় নেন। তিনি পুলিশের ইউনিফর্ম খুলে ফেলেন। একজনের কাছ থেকে তিনি গেঞ্জি চেয়ে নেন। যিনি তাকে গেঞ্জি ধার দিয়েছিলেন, তিনিই সবাইকে বলে দেন ভেতরে পুলিশ। এরপর সৌমেন দৌড়ে এসে একটা ড্রেনের মধ্যে প্রায় চার ঘণ্টা শুয়ে ছিলেন। পরে খাল দিয়ে ভাসতে ভাসতে অন্য স্থানে গিয়ে নিজের জীবন বাঁচান সহকারী পুলিশ কমিশনার সৌমেন বিশ্বাস।
২০১৩ সালের ১ এপ্রিল রাজশাহীতে ইসলামী ছাত্র শিবিরের কর্মীরা শালবাগান এলাকায় যেভাবে পিটিয়ে ও এবং মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করে মারাত্মক জখম করেছিল। পুলিশ সদস্য মরে গেছে ভেবে শিবির কর্মীরা চলে যায়। তবে দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বেঁচে যান ওই পুলিশ সদস্য। রাজশাহীতে যেভাবে পুলিশকে পিটিয়ে ও মাথায় ইট দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল ঠিক একই কায়দায় খুলনায় পুলিশ সদস্য সুমন কুমার ঘরামীকে হত্যা করা হয়।




