১৮ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ | ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ |
  • প্রচ্ছদ
  • জাতীয় >> টপ নিউজ
  • ফেনীতে নিয়ন্ত্রণহীন নূরানী মাদ্রাসা!
  • ফেনীতে নিয়ন্ত্রণহীন নূরানী মাদ্রাসা!

    দৈনিক আমার ফেনী

    জমির বেগ
    ফেনীতে নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে গড়ে উঠেছে হাজার খানেক নূরানী মাদ্রাসা। মাদরাসাগুলোর উপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দিন দিন এ মাদরাসাগুলোর সংখ্যা শুধু বাড়ছে। জেলার বিভিন্ন গ্রামেগঞ্জে এমনকি শহরের বিভিন্ন অলিতে গলিতে গড়ে উঠেছে ব্যাঙের ছাতার মতো নূরানী মাদরাসাগুলো। ছোট ছোট বাসা ভাড়া নিয়ে গড়েতোলা হচ্ছে এসব মাদরাসা। কোন অনুমোদন ছাড়াই, কোন সিলেবাস ছাড়াই যে যার মতো করে প্রতিষ্ঠা করছে এসব নূরানী মাদরাসা।
    নূরানী মাদ্রসাগুলো মূলত মুক্তব পর্যায়ের হলেও ব্যবসার লালসায় কিছু মহল এগুলোকে পূর্ণাঙ্গ স্কুলের রুপে উপস্থাপন করছে। অভিভাবকদের বেহেস্তে যাওয়ার কথা বলে তাদের সন্তানদের ভর্তি করিয়ে নিচ্ছে এসব মাদরাসায়। এতে ধবংস হয়ে যাচ্ছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা।
    দেশের বিভিন্ন মসজিদে আগে মুক্তব থাকলেও বর্তমানে বিলুপ্তির পথে রয়েছে মুক্তবগুলো। মুক্তবগুলো বিলুপ্তি হওয়ার সুযোগ নিচ্ছে এসব নূরানী মাদরাসাগুলো। যে কারো মন চাইলে নীতিমালা ছাড়াই শিক্ষার পরিবেশ ঠিক না করেই তারা গড়ে তুলছেন নূরানী মাদরাসা।
    শিক্ষানুরাগী ও শিক্ষাবীদরা জানান, এসব প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করে শিক্ষার্থীরা না হচ্ছে আলেম না হচ্ছে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত। এসব মাদরাসার শিক্ষার্থীরা বাংলা, ইংরেজি, অংক এমনকি আরবি পর্যন্ত ঠিকমতো জানে না। তারা মুখস্ত কিছু সুরা ও দোয়া-কেরাত ছাড়া কিছুই পারে না। এসকল নূরানী মাদরাসার কারনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। বন্ধ হয়ে গেছে বিভিন্ন কিন্ডার গার্টেন। বন্ধের পথে রয়েছে অনেক কিন্ডার গার্টেন। সরকারি সংশ্লিষ্ট দপ্তর এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এ নূরানী মাদরাসাগুলো জাতির জন্য অশনি সংকেত বলে মনে করেন তারা।
    এদিকে অভিভাবক, শিক্ষক ও সচেতনমহল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার নীতিমালা বাস্তবায়নের দাবীর পাশাপাশি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ারও দাবী জানান। ইউসুফ আলী নামে এক ব্যক্তি জানান, এসব মাদরাসার কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নির্ধারিত বেতন নিলেও মাদরাসার সামনে এতিমখানা লেখে তারা ভিক্ষাবৃত্তি করছে। তারা শিক্ষার্থীদের থেকেও টাকা নিচ্ছে আবার এতিমের নাম করে খয়রাতও নিচ্ছে। মাদরাসার ছোট ছোট শিশু শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন হাট-বাজারে পাঠিয়ে টাকা তুলাচ্ছে। তিনি বলেন, একদিন একটি দাওয়াতে গেলাম। সেখানে গিয়ে দেখলাম ছোট ছোট মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাওয়ার খাচ্ছেন। বাচ্চাগুলোর পরিচয় জিজ্ঞাস করলে আয়োজকরা জানান বাচ্চাগুলো এতিম। বাচ্চাদের সাথে আলাপকালে জানতে পারি এতিমে সাড়িতে যারা আছেন তারা কেউ এতিম নয়। ওই বাজারের বর্তমানে সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যবসায়ীর ছেলেও আছেন তাদের মধ্যে।
    ফেনী শহরের নাজির রোড়ের ৪তলার একটি ভবনের নীচ তলায় ৪টি কক্ষ নিয়ে খোলা হয়েছে মারকাযুল কোরআন ইসলামিয়া মাদরাসা। সরেজমিনে দেখা যায়, মাদরাসাটির চারদিকের দরজা জানালা বন্ধ। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। মিটমিট আলো জ্বালিয়ে একটি কক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন এক কিশোর। আলাপকালে জানা যায়, তিনি ৯ম শ্রেনি পাশ শিক্ষক। তিনি জানান, আমি নূরানীতেও আছি আবার কিতাব বিভাগেও পড়াই। আমি কাফিহি মানে নাইন পর্যন্ত পড়ছি, বাংলা স্কুলে যা নাইন বলে আরকি। এখানে ৪টা ক্লাস রুম আর অফিস রুম একটা আছে। এখানে আমরা আরবী পড়াই। মাদরাসায় যা পড়ায় এগুলা আমরা পড়াই আরকি।
    আরেক শিক্ষককে জানালা বন্ধ রাখার কারন জানতে চাইলে তিনি বলেন, জানালা বন্ধ থাকলে মানুষের কানে আওয়াজ কম যায়। বিল্ডিং ঘরতো আওয়াজ একটু বাইরে গেলে আমাদের আশে পাশে সব বাড়ি ঘর। সকাল সকাল আমরা জোরে পড়াই। হেরগো ঘুমের দৃষ্টাব হয়। অনেক দিয়া সমস্যা হয় তো আমরা জানালাগুলা বন্ধ রাখি। যার কারনে আওয়াজটা কম যায় বাহিরে। এ কারনে আমরা জানালা দরজা বন্ধ রাখি। তারপর আবার মহিলারা চলাফেরা করে। চারপাশে বাসা। এ কারনে আমরা বন্ধ রাখি। এই প্রতিষ্ঠানের মত আরো কয়েকশ প্রতিষ্ঠান রয়েছে শুধু ফেনী শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে।
    আরেকটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. মোরতুজা জানান, তাদের স্কুলের ক্লাস সাড়ে আটটা থেকে সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত চলে। তাদের মাদরাসার পাশে আরো কয়েকটি মাদরাসা থাকায় শিক্ষার্থী সংখ্যা তেমন বেশি নয়। তিনি জানান, গরীব শিক্ষার্থীদের থেকে টাকা কম নেয়া হয়। ধনীদের থেকে টাকা নেয়া হয়।
    দাগনভূঞার পূর্ব চন্দ্রপুর ইউনিয়নের একটি স্কুলের শিক্ষক ছায়েদুল হক বলেন, আমাদের কিন্ডার গার্টেনের আশেপাশে গত ৩ বছরে অন্তত ৫টি নূরানী মাদরাসা গড়ে উঠছে। একটি মাদরাসার চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্র আমাদের স্কুলে এসেছিলো ভর্তি হতে। তার বয়স হয়েছে ১২ বছর। তাকে নার্সারীর বাংলা বই পড়তে দিলে দেখি সে অক্ষরও চিনে না।
    ফেনী সিটি গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক মামুনুর রশিদ বলেন, মক্তব শিক্ষা হারিয়ে যাবার সুযোগে যত্রতত্র, বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় মাদরাসাগুলো উড়ে উঠেছে। এক একটি পাড়ায় ২০টা পর্যন্ত মাদারাসা দেখা যায়। কোন কোন বিল্ডিং এ ২টা ৩টা পর্যন্ত মাদরাসা আছে। এখানে শিক্ষার কোন অনুকূল পরিবেশ নেই। যার প্রেক্ষিতে এ মাদরাসা গুলো আজকে আছে, দেখা যাচ্ছে ২মাস পরে আর নেই। এরা শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ যেমন দিতে পারছে না। তেমন উচ্চ শিক্ষিত জনগোষ্ঠী উপহার দিতে পারছে না। পারছে না একজন দক্ষ আলেম উপহার দিতে।
    এদিকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাহারি নাম ও চটকদার বিজ্ঞাপনের সাইনবোর্ড সাঁটানো হয়েছে পুরো জেলা ও শহরে। ধর্মান্ধ, ধর্মভীরু, ভ্রান্ত ধারনা থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভর্তি করাচ্ছেন। বেহেস্তে যাওয়ায় আসায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করছেন।
    সাহাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবুল চন্দ্র দাশ বলেন, আমার স্কুলে গত বছর দ্বিতীয় শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিলো সাতজন। চারজনকে তাদের অভিভাবক মাদরাসায় নিয়ে গেছে। এবছর থ্রীতে আছে তিনজন। এর পিছনে অভিভাবকদের অসচেতনতা, ধর্মভীরুতা এবং সমাজও অনেকটা দায়ী। বর্তমানে আমার স্কুলের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৬ এ নেমে এসছে। গত বছর ছিলো ৫৩জন।
    আজিজুল হক নামের এক অভিভাবক বলেন, মাদরাসা শিক্ষা দরকার আছে তাবে কোন ভাবেই স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষা বাদ দেয়া যাবে না। মাদরাসাগুলোকে নীতিমালার মধ্যে আনতে হবে। এসব মাদরাসার শিক্ষকরাইতো বিঝু জানে না। তারা শিক্ষার্থীদের কি শিক্ষা দিবে। আধুনিক এ বিজ্ঞানের যুগে পিছিয়ে থাকা যাবে না। হে আমারদের ধর্মীয় শিক্ষাও প্রয়োজন। প্রতিটি মসজিদে আবার আগেরমতো মুক্তব খুলা উচিত।
    শহরের রামপুরের হাজী সামছুল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আশেক বলেন, ফেনীতে আসলে অনিবন্ধিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। তো আমার কাছে মনে হচ্ছে যে একটি সুস্থ্য নীতিমালা হওয়া দরকার। যাতে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে গড়ে উঠে এবং অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকার পদক্ষেপ নেয়। একই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক কামাল উদ্দিন বলেন, কিছু অভিভাবক আছে তাদের সন্তানদের মাদরাসায় পড়নোর জন্য নিজেদের পরিকল্পনা থাকে। এজন্য অনেকে শিক্ষকদের কাছ থেকে বা মাহফিল থেকে উৎসাহ পায় মাদরাসায় ভর্তি করানোর জন্য। আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি একজন করে ধর্মীয় শিক্ষক রাখা হয় এবং পাঠ্যক্রমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নূরানী সংযোজন করা হয় ভালো হবে।
    দারুল কোরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদরাসার নির্বাহী পরিচালক তাজুল ইসলাম বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো হয় বেপাক, বেপাকুল মাদরাসাতুল কওমিয়া অথবা এত্তেহাত বোর্ড আছে এ জাতীয় বোর্ড এর আন্ডারে হয় তাহলে ওই বোর্ডের ওই নিয়মে চলবে। সবাই এক নিয়মে এক নীতিমালা থাকলে প্রত্যেকের পড়ার মানটা ভালো চলবে। সবাই এক নিয়মে চলবে এমন একটা নীতিমালা দরকার।
    ফেনী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নাছির উদ্দিন আহমেদ জানান, এসব মাদ্রাসার কারনে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা ধবংস হয়ে যাচ্ছে। এগুলো সরকার কর্তৃক অনুমোদীত কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। আমি কয়েকটি নূরানী মাদ্রাসার ক্লাস ফোর ফাইভের শিক্ষার্থীর সাথে কথা বলে দেখেছি তারা বাংলা অক্ষরও চিনে না। জান্নাতে যাবে, সাথে ১০-১৫ জনকে নিয়ে যাবে এসব কথা বলে বলে স্কুল গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে তারা। আমাদের অনেক সিনিয়র লোকজনও তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। সরকারকে কঠোর হওয়া দরকার। তারা নূরানী চালাক। সকালের দিকে এক-দুই ঘন্টা চালাক। আমরাও মুক্তবেই আরবি শিখেছি। এর মানেতো এই নয় যে মুক্তব গুলোকে তারা স্কুল বানিয়ে ফেলবে। স্কুলের একই সময়ে মাদরাসাগুলো চালানোর কারনে অনেকে আর স্কুলে পড়ছে না। আমি জেলা প্রশাসক মহোদয়কেও এব্যাপারে অবহিত করেছি। কিছু অভিভাবক জান্নাত পাওয়ার আশায় তাদের সন্তানদের স্কুলে পড়ালেখাও বন্ধ করে দিয়েছে। জেলায় কতগুলো নূরানী মাদ্রাসা আছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানগুলোরতো কোন রেজিস্ট্রেশনই নেই। কিভাবে গণনা করবো। দেখা যাচ্ছে একটি মাদরাসার পাশে ৩টি ৪টি এমনকি ৫টি মাদরাসাও গজিয়ে উঠেছে। আবার দেখা গেছে মাদরাসার সংখ্যা কমে গেছে। আবার দেখা যায় আরেক জায়গায় নতুন করে গড়ে উঠছে। তিনি প্রতিবেদককে এ নিয়ে ভালা করে প্রতিবেদন করে জনগণকে জাগিয়ে তুলার আহবান জানান।
    জেলায় ঠিক কতটি নূরানী মাদ্রাসা গড়ে উঠেছে তার সঠিক হিসেব নেই জেলা প্রশাসনের কাছেও। ফেনী জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহিনা আক্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে গড়ে উঠছে তা আসলে কাম্য নয়। এগুলো নিয়ে আমরা চিন্তা করছি। আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অবহিত করেছি। সামনে যেহেতু আমাদের একটি বড় ফোরামের সম্মেলন আছে সেখানেও আমরা এ ব্যাপরে উপস্থাপন করবো। আমরা সেখানে বাস্তবিক অবস্থানটি তুলে ধরবো। মূল কথা হলো তাদের অবশ্যই নীতিমালার মধ্যে আসা উচিত।

    আরও পড়ুন

    মেধার অন্ধ অহংকারে অন্যকে অসম্মান করার অদম্য স্পৃহা থেকে বের হয়ে আসুন
    বিভ্রান্তিকর ও স্বার্থপরতার আন্দোলন!
    প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিকৃত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা
    ফেনীতে মাদকদ্রব্য অবৈধ পাচার বিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস পালিত
    মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরা পাবে না তো রাজাকারের নাতিরা পাবে?
    মেধা-কোটা বিতর্ক
    গ্রেফতার হলেন ব্যারিস্টার সুমনকে হত্যার হুমকিদাতা
    কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়ে আপিল বিভাগের স্থিতাবস্থা জারি